| |

সাওম শব্দের অর্থ কি? সাওম কাকে বলে এবং কত প্রকার?

সিয়াম শব্দের অর্থ কি, সাওম শব্দের অর্থ কি, সাওম কাকে বলে, সাওম অর্থ কি, সাওম কত প্রকার ও কি কি, সাওমের মূল উদ্দেশ্য কি, রোজা কাকে বলে, রোজা শব্দের বাংলা অর্থ কি

সাওম-শব্দের-অর্থ-কি-সাওম-কাকে-বলে-সাওম-কত-প্রকার

সাওম শব্দের অর্থ কি? সাওম কাকে বলে এবং কত প্রকার?

বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম, আজকের আলোচনার বিষয় হচ্ছে সাওম শব্দের অর্থ কি, সাওম কাকে বলে, সাওম কত প্রকার কি কি এবং সাওমের মূল উদ্দেশ্য কি।

সাওম শব্দের অর্থ কি

আরবি সাওম (صَوۡمُ) শব্দের অর্থ বিরত থাকা। এর বহুবচন হচ্ছে সিয়াম (صِيَام)। বাংলাতে আমরা সাওমকে রোজা বলে জানি কিন্তু তা ঠিক নয়। রোজা ফারসি শব্দ যার অর্থ উপবাস থাকা। অতএব আমাদের উচিত সাওম বা সিয়াম শব্দ ব্যবহার করা।

সাওম কাকে বলে

ইসলামী শরীয়তের পরিভাষায় সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত নিয়তের সাথে সকল প্রকার পানাহার, কামাচার ও পাপাচার থেকে বিরত থাকার নামই হচ্ছে সাওম।

সাওমের মূল উদ্দেশ্য কি

সাওমের লক্ষ্য-উদ্দেশ্যের দিকে ইঙ্গিত করে মহান আল্লাহ বলেন:

হে মুমিনগণ! তোমাদের উপর সিয়াম ফরয করা হয়েছে, যেভাবে ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর। যাতে তোমরা তাকওয়া অবলম্বন করো। (সূরা বাকারা ১৮৩)।

এ আয়াতে আল্লাহ (সুব:) সিয়াম ফরজ করার উদ্দেশ্যকে সংক্ষিপ্তভাবে আলোচনা করেছেন। আমরা এটাকে আরেকটু বিস্তারিতভাবে আলোচনা করতে গেলে যে লক্ষ্য-উদ্দেশ্যগুলো দেখতে পাই তা হলো নিম্নরূপ:

প্রথমত:

আল্লাহ (সুব:) মানবজাতিকে সৃষ্টি করেছেন শুধুমাত্র তার ইবাদত করার জন্য। কুরআনুল কারীমে ইরশাদ হচ্ছে: আমি মানুষ এবং জ্বীনদের সৃষ্টি করেছি শুধুমাত্র আমার ইবাদত করার জন্য।” (সূরা যারিয়াত: ৫৬)

আর সিয়ামের মাধ্যমে মানুষ তার রবের ইবাদত করে থাকে। কারণ একজন মানুষ যখন কাউকে ভালোবাসে তখন প্রথমে তার প্রতি আস্থাশীল হয়। তারপর তার আনুগত্য প্রকাশ করে। তারপর প্রয়োজনে তার জন্য বাড়ি-ঘর ত্যাগ করে। তারপর তার জন্য খানা-পিনা ইত্যাদি ত্যাগ করে। ঠিক তেমনিভাবে মানুষ ঈমানের মাধ্যমে আল্লাহর প্রতি আস্থাশীল হয়। এরপর সালাতের মাধ্যমে প্রথমে আনুগত্য প্রকাশ করে। হজ্জের মাধ্যমে বাড়ি-ঘর ত্যাগ করে। যাকাতের মাধ্যমে অর্থ- সম্পদ ব্যায় করে। আর সাওমের মাধ্যমে খানা-পিনা ও স্ত্রীকে ত্যাগ করে। এভাবে সিয়ামের মাধ্যমে বান্দা আল্লাহ (সুব:) এর চূড়ান্ত ইবাদাহ (আনুগত্য) প্রকাশ করে থাকে।

দ্বিতীয়ত:

মানুষের মধ্যে দুইটি বিপরীতমুখি বৈশিষ্ট্য রয়েছে। একটি ফেরেশতাদের বৈশিষ্ট্য আর তা হচ্ছে আল্লাহর ইবাদাত করা। আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে পশুর বৈশিষ্ট্য আর তা হচ্ছে খানা-পিনা করা, স্ত্রী ব্যবহার করা, সন্তান জন্ম দেয়া, ঘুম যাওয়া ইত্যাদি। কিন্তু এই দুটি বৈশিষ্ট্যের মধ্যে একমাত্র প্রথমটিই হচ্ছে মানব সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্য। আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে প্রয়োজন। সিয়ামের মাধ্যমে মানুষ পশুর বৈশিষ্ট্যকে ত্যাগ করে ফেরেশতাদের বৈশিষ্ট্যকে অগ্রাধিকার দিয়ে জানিয়ে দিচ্ছে যে, আমাদের খাওয়া-দাওয়া, স্ত্রী ব্যবহার করার চাহিদা থাকা সত্ত্বেও আমরা সেগুলোকে ত্যাগ করে আল্লাহর ইবাদত করতে পারি।

তৃতীয়ত:

সিয়ামের মাধ্যমে মানুষ তার গোপন রোগ সমূহ যথা: কাম- ক্রোধ, লোভ-মোহ ইত্যাদির চিকিৎসা করে থাকে। কারণ যেভাবে সকল জিনিসের মৌলিক উপাদান চারটি। ক. আগুন খ. পানি গ. মাটি ঘ. বাতাস। মানুষের মধ্যেও এই চারটি মৌলিক উপাদান বিদ্যমান। আর এগুলোর প্রতিটির মধ্যে এক একটি মারাত্মক ক্ষতিকর রোগ রয়েছে। আগুনের স্বভাবগত বৈশিষ্ট্য হলো অহংকার। যদি আগুন জ্বালানো হয় তাহলে তা উপরের দিকে চড়তে থাকে। এ কারণেই ইবলিস অহংকার করেছিল। পানির স্বভাবগত বৈশিষ্ট্য হলো লোভ। যে কারণে পানি সমতল জায়গায় ছাড়লে সে খুব সহজেই সাধ্যমত অনেক জায়গা দখল করে নেয়। মাটির স্বভাবগত বৈশিষ্ট্য হলো কৃপনতা। যে কারণে মাটির উপরে যা কিছু রাখা হয় আস্তে আস্তে সে তা নিজের ভেতরে লুকিয়ে ফেলে। আর বাতাসের স্বভাবগত বৈশিষ্ট্য হচ্ছে নিজের অস্তিত্ব সর্বত্র বিরাজমান রাখা।

মানুষের মধ্যে যেহেতু উপরোক্ত চারটি উপাদানই রয়েছে তাই তার মধ্যে এই স্বভাবগুলোও বিদ্যমান। যেহেতু তার মধ্যে আগুন রয়েছে তাই তার মধ্যে অহংকার সৃষ্টি হয়। এই অহংকার রোগের চিকিৎসার জন্য আল্লাহ (সুব:) সালাতের বিধান দিয়েছেন। সালাতের মাধ্যমে মানুষ আল্লাহর সামনে হাত বেঁধে অপরাধির ন্যায় দাড়িয়ে, তারপরে রুকুর মাধ্যমে মাথা ঝুকিয়ে তারপরে সেজদার মাধ্যমে তার সর্বশ্রেষ্ঠ অঙ্গ চেহারাকে মাটির সঙ্গে মিলিয়ে নিজেকে আল্লাহর গোলাম হিসাবে পেশ করে। সে যেন জানিয়ে দিল যে, আমি মাটি থেকেই তৈরি হয়েছি আবার মাটির সাথেই মিশে যাব আমার অহংকার করার কিছু নেই।

আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন: মাটি থেকেই আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি, মাটিতেই আমি তোমাদেরকে ফিরিয়ে নেব এবং মাটি থেকেই তোমাদেরকে পুনরায় বের করে আনব।” সূরা তাহা ৫৫।

তুমি যদি কিছু মর্যাদা অর্জন করতে চাও তবে নিজের আমিত্বকে মিটিয়ে দাও। যেমনিভাবে একটি শস্য দানা নিজেকে মাটির সঙ্গে মিটিয়ে দিয়ে একটি সুন্দর বাগান উপহার দেয়।”

আবার যেহেতু মানুষের মধ্যে আরেকটি মৌলিক উপাদান রয়েছে মাটি। সেকারণেই মানুষ কৃপণ হয়। হাদীসে বলা হয়েছে :

মুতাররিফ (রা:) তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন যে, আমি আল্লাহর রাসূল (সা:) এর নিকটে এলাম তখন কুরআন পাঠ করছিলেন। এরপর রাসূলুল্লাহ (সা:) বললেন: বনি আদম বলে থাকে ‘আমার মাল, আমার মাল’। রাসূল (সা:) বলেন হে বনী আদম তুমি কি চিন্তা করে দেখেছ যে, তোমার কি মাল? তোমার মাল তো শুধু তাই যা তুমি পেট ভরে খেয়েছ এবং নষ্ট করেছ অথবা পরিধান করেছ এবং পুরাতন করেছ অথবা সাদাকাহ করেছ (আল্লাহর কাছে সঞ্চয় করেছ)। সুতরাং যেহেতু মানুষের মধ্যে এই কৃপণতার রোগ রয়েছে তাই এ রোগের চিকিৎসার জন্য আল্লাহ তায়ালা যাকাতের বিধান দিয়েছেন। মানুষের মধ্যে আরেকটি মৌলিক উপাদান রয়েছে বাতাস।

আর এই বাতাসের কারণেই মানুষ চায় যে সবাই তাকে জানুক। তার নাম প্রচার হোক। অর্থাৎ ‘রিয়া’ বা লৌকিকতা। অথচ এ ‘রিয়া’ বা লৌকিকতা হচ্ছে গোপন শিরক। তাই এ রোগের চিকিৎসার জন্য ফরজ করা হয়েছে হজ্জ। হজ্জের জন্য মানুষকে এহরামের কাপড় পড়তে হয় এর মাধ্যমে পোশাকের গৌরব, ভাষার গৌরব ত্যাগ করে আরাফাহ, মুজদালিফা ও মিনা ময়দানে সাদা-কালো, আমীর-গরিব সকলকে একই ময়দানে অবস্থান করতে হয় কারো কোন বিশেষ মর্যাদা থাকে না। আর যখন কোন আলাদা বিশেষত্ব না থাকে তখন আর নাম-দাম প্রকাশের কোন সুযোগও থাকে না। এভাবে হজ্জের মাধ্যমে ‘রিয়া’ রোগের চিকিৎসা হয়ে যায়।

সর্বশেষ মৌলিক উপাদান হচ্ছে পানি। আর পানি স্বভাবগত বৈশিষ্ট্য হচ্ছে লোভ। সে কারণেই পানি যদি কোন সমতল জায়গায় ঢেলে দেওয়া হয় তাহলে সে আস্তে আস্তে আরো অনেক জায়গা দখল করে নেয়। মানুষের মধ্যে যেহেতু পানি আছে তাই এই পানির কারণেই মানুষের মধ্যে লোভ বিদ্যমান। যার ফলে সে সবসময় চিন্তা করে কিভাবে অন্যের সম্পদ, জায়গা-জমি দখল করা যায়, কিভাবে ভাল খাবার-দাবার, দামী পোশাক- পরিচ্ছেদের ব্যবস্থা করা যায়, কিভাবে অন্যের সুন্দরী স্ত্রী অথবা সুন্দরী মেয়েকে ভোগ করা যায়। এই রোগের চিকিৎসার জন্য আল্লাহ তায়ালা সাওমকে ফরজ করে দিয়েছেন।

ইরশাদ হচ্ছে: হে মুমিনগণ, তোমাদের উপর সিয়াম ফরয করা হয়েছে, যেভাবে ফরয করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর। যাতে তোমরা তাকওয়া অবলম্বন কর। (সূরা বাকারা ১৮৩)।

একজন মানুষ যখন আল্লাহর নির্দেশ মোতাবেক সিয়াম পালন করে তখন তার সামনে যত লোভনীয় খানা-পিনা, সুন্দরী নারী পেশ করা হোক না কেন সে এগুলো আল্লাহকে ভয় করে বর্জন করবে। এটাকেই হাদীসে বলা হয়েছে:

আবূ হুরাইরা (রা:) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন নবী (সাঃ:) বলেছেন, মহান আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ কিন্তু রোজা আমারই জন্য এবং আমি নিজেই এর প্রতিফল দান করবো। কেননা সে আমার জন্যই তার কামনা-বাসনা, খানা-পিনা ত্যাগ করে।

সহীহ বুখারী: ৬৯৮৪ ; সহীহ মুসলিম: ২৫৭৩; সুনানে নাসাঈ: ২২১১; সুনানে তিরমিজি: ৭৬১; সুনানে ইবনে মাজাহ: ১৬৩৮।

এই হাদীসে বলা হয়েছে, ‘সাওম আমারই জন্য’: অথচ সকল ইবাদতই আল্লাহর জন্য। তবে অন্যান্য ইবাদত যেমন, সালাত, হজ্জ, যাকাত ইত্যাদি লোক দেখানোর জন্য কেউ কেউ করতে পারে। কিন্তু রোজার মধ্যে লোক দেখানোর প্রবৃত্তি থাকে না। কারণ গোপনে পানাহার করলে আল্লাহ ছাড়া কেউই জানতে পারে না। আর একমাত্র আল্লাহর ভয় ছাড়া কিছু তাকে বাধা দেয় না। তাই আল্লাহ নিজেই এর প্রতিদান দিবেন। আর দাতা যখন নিজ হাতে দান করেন বেশীই দান করেন।

এ হাদীসে স্পষ্ট হয়ে গেল যে, সিয়ামের মাধ্যমে মানুষ তার রবের সন্তুষ্টির জন্য লোভ নিয়ন্ত্রণ করে পশুত্বের স্বভাবকে বিসর্জন দিয়ে ‘আবদিয়্যাত’ বা ‘আল্লাহর দাসত্বের’ সিফাতকে অর্জন করে। সুতরাং যদি সাওমের মাধ্যমে এই উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন না হয় তাহলে শুধু শুধু খানা- পিনা ত্যাগ করে কোন লাভ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা:) এ সম্পর্কে ইরশাদ করেন :

আবূ হুরাইরা (রা:) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন রাসূলুল্লাহ (সা:) বলেছেন, যে ব্যক্তি সিয়াম পালন করা সত্ত্বেও মিথ্যা কথা ও হারাম কাজ ত্যাগ করতে পারল না। তার খাবার-দাবার পরিত্যাগ করার ব্যাপারে আল্লাহর কোন প্রয়োজন নেই। (সহীহ বুখারী ১৯০৩)।

অন্য এক হাদিসে রাসূলুল্লাহ (সাঃ:) এরশাদ করেন:

আবূ হুরাইরা (রা:) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা:) বলেছেন, অনেক সায়েম এমন আছে যার ভাগ্যে ক্ষুধা আর পিপাসা ছাড়া অন্য কিছুই নাই। অনেক রাত্রি জাগরণ করে ইবাদত কারী আছেন যাদের ভাগ্যে রাত্রি জাগরণ ব্যতিত আর কিছুই নাই। (সুনানে দারেমী ২/৩০১, হাদীসটি সহীহ)।

এ হাদীসগুলোতে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, শুধু ক্ষুধার্ত এবং পিপাসায় কাতর থাকার নামই সাওম নয়। বরং এর মাধ্যমে সকল প্রকার পশুত্বকে বর্জন করে এক ‘ইলাহের’ বিধান মেনে নিয়ে জীবনের সকল ক্ষেত্রে তা বাস্তবায়ন করাই সিয়ামের মূল উদ্দেশ্য। সিয়াম অবস্থায় যখন আমরা উন্নতমানের খাবার ও সুন্দরী যুবতী নারীদের প্রতি আকর্ষণ থাকা সত্ত্বেও আল্লাহ (সুব:) এর নির্দেশ মেনে তা থেকে বিরত থাকি সেই একই আল্লাহর নির্দেশ মেনে মিথ্যা কথা, ধোঁকা দেওয়া, চোগলখোরি করা, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, জেনা, ব্যভিচার, রাহাজানি, মদ, সুদ, জুয়া, উলঙ্গপনা, বেহায়াপনা, খুন, ধর্ষণ, মূর্তিপূজা, আগুন পূজা, পীর পূজা, গাছ পূজা, মাছ পূজা, পাথর পূজা, মাজার পূজা, মন্ত্রিপূজা, এম-পি পূজা, নেতা-নেত্রী পূজাসহ সব কিছুকে বর্জন করতে হবে।

এখানে একটি লক্ষণীয় বিষয় এই যে, এই দীর্ঘ আলোচনায় প্রমাণিত হলো যে সালাত, যাকাত, সাওম, হজ্জ, এই চারটি হচ্ছে মৌলিক চারটি রোগের ঔষধ আর এ কথা সকলেরই জানা যে, ঔষধ খেতে হলে অব্যশই ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী খেতে হবে। উল্টা পাল্টা খেলে লাভের চেয়ে ক্ষতি হওয়ার আশংকাই বেশী। ঠিক তেমনিভাবে এই চারটি ঔষধকেও নিজের মন মতো আদায় করলে চলবে না। বরং আল্লাহর নির্দেশ মোতাবেক, রাসূলুল্লাহ (সা:) এর তরীকা অনুযায়ী করতে হবে। এজন্যই একটি সহীহ হাদীসে বলা হয়েছে:

আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা:) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন রাসূলুল্লাহ (সা:) বলেছেন: ইসলাম পাঁচটি ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত। আল্লাহর এককত্ব ঘোষণা করা, সালাত কায়েম করা, যাকাত আদায় করা, রমজানে সিয়াম পালন করা এবং হজ্জ করা।

সহীহ মুসলিম ১৯ নং হাদীস; সহীহ বুখারী ৮ নং হাদীস; সুনানে তিরমিজি ২৬০৯ নং হাদীস।

এই হাদীসে ইসলামকে একটি তাবুর সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। তাবুর চার কোনায় চারটি খুঁটি থাকে এবং মাঝখানে একটি বড় পিলার থাকে। এই বড় পিলারটি যদি না থাকে তাহলে ঐ চার কোনার চারটি পিলারের কোনই মূল্য থাকে না। ঠিক তেমনিভাবে সালাত, যাকাত, সাওম, হজ্জ এগুলোরও কোনই মূল্য থাকবে না যদি শিরকমুক্ত তাওহীদ ও বিদআতমুক্ত সুন্নাহর উপরে প্রতিষ্ঠিত না হয়। একারনেই এ হাদীসে বলা হয়েছে ইসলামের বেনা পাঁচটি। আর তার মূল বেনা হলো ঈমান। আর এই কারণেই সাওমের সঙ্গেও এই শর্তটি গুরুত্বসহকারে জুড়ে দেয়া হয়েছে। সহীহ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে:

আবূ হুরাইরা (রা:) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা:) ইরশাদ করেছেনঃ যে ব্যক্তি ঈমানসহ সওয়াবের আশায় রমজানের সিয়াম পালন করে, তার পূর্বের গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয় এবং যে ব্যক্তি ঈমানের সঙ্গে ও সওয়াবের আশায় লাইলাতুল কদরে ইবাদত করে তার পূর্বের সকল গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়। (সহীহ বুখারী ৩৭; সহীহ মুসলিম ১৬৫৬)।

এই হাদীসে স্পষ্টভাবে ঈমানের শর্ত আরোপ করা হয়েছে। তাই তাওহীদের আকিদার ভিত্তিতে যদি সিয়াম পালন করা হয় তবেই সিয়ামের মূল উদ্দেশ্য অর্জিত হবে।

চতুর্থত:

সিয়ামের মাধ্যমে গরীব-দুঃখী ও অসহায় মানুষের সত্যিকার অবস্থা উপলব্ধি করা যায়। কেননা সায়েম ব্যক্তি ভোর রাতে সারী খেয়ে আবার ইফতারীর পরে হরেক রকম খাবারের আয়োজন থাকা সত্ত্বেও বিকেল বেলা ক্ষুধার তাড়নায় ক্লান্ত হয়ে পরে। তাহলে যে গরীব পিছনের বেলা খেতে পায় নি, ভবিষ্যতের জন্য তার কোন আয়োজন নেই, তার মনের অবস্থা কি? এটা উপলব্ধি করে একদিকে আল্লাহর নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করা। অপরদিকে গরীব-দুঃখী মেহনতি মানুষের সাহায্যে এগিয়ে আসা সিয়ামের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য। এজন্যই হাদীসে বলা হয়েছে:

সালমান (রা:) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা:) বলেছেন: রমজান মাস হচ্ছে সহমর্মিতার মাস। (সহীহ ইবনে খুজাইমা ১৮৮৭)।

সাওম কত প্রকার ও কি কি

সাওম প্রথমত চার প্রকার। ফরজ, নফল, হারাম ও মাকরূহ।

ফরজ সাওম:

ফরজ সাওম তিন প্রকার। (ক) রমজানের সিয়াম। (খ) কাফফারার সিয়াম। (গ) মান্নতের সিয়াম।

নফল সাওম:

নফল সাওম কয়েক প্রকার। (১) শাওয়াল মাসে ছয়টি সাওম। (২) জিলহজ্জ মাসের প্রথম দশ দিন বিশেষ করে আরাফাতের ময়দানে অবস্থানকারী হাজীগণ ছাড়া সাধারণ মুসলমানদের জন্য আরাফার দিন সাওম। (৩) মুহাররম মাসের সাওম। বিশেষ করে আশুরার দিন ও তার আগের বা পরের দিন সহ। (৪) শাবান মাসের বেশির ভাগ অংশ সিয়াম পালন করা। (৫) ‘আশহুরুল হুরুম’ (জিলক্বদ, জিলহজ্ব, মুহাররম, রজব) মাসের সিয়াম। (৬) প্রতি সোমবার ও বৃহস্পতিবারের সিয়াম। (৭) প্রতি মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ (আইয়্যামে বিজ) এর সিয়াম। (৮) সাওমে দাউদ (একদিন পর একদিন সাওম রাখা অর্থাৎ একদিন সাওম রাখবে এরপর রাখবে না)।

হারাম সাওম:

হারাম সাওম: (১) দুই ঈদের দুই দিন। (২) ‘আইয়্যামে তাশরীক’ (কুরবানী ঈদের পর তিন দিন)।

মাকরূহ সাওম:

(১) শুধু জুমার দিন খাস করে সাওম রাখা। কারণ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে:

আবু হুরাইরা (রা:) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা:) বলেছেন: জুমার দিন কেউ যেন সাওম না রাখে। কিন্তু যদি কেউ জুমার দিনের আগে বা পরে একদিন সাওম রাখে তাহলে সে জুমআর দিন সাওম রাখতে পারবে। (সহীহ মুসলিম ২৫৪৯)।

(২) শুধু শনিবার দিন সাওম রাখা। হাদীসে ইরশাদ হয়েছে:

আবদুল্লাহ ইবনে বুসর (রা:) তার বোন থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন রাসূলুল্লাহ (সা:) বলেছেন, তোমরা শনিবার দিন ফরজ সাওম ব্যতীত অন্য কোন সাওম রাখিও না। এমনকি যদি তোমরা আঙ্গুর গাছের ছাল অথবা যে কোন গাছের ডাল ছাড়া অন্য কিছু না পাও তাহলে তাই চিবাবে। (সুনানে তিরমিজি ৭৪৪; হাদীসটি সহীহ)।

(তবুও শুধু শনিবারে সাওম রাখবে না কেননা এ দিনটাকে ইয়াহুদীরা সম্মান করে থাকে)।

(৩) ‘ইয়াওমুশ শাক’ বা ‘সন্দেহের দিনের’ সাওম। শাবান মাসের ২৯ তারিখে আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকার কারণে চাঁদ দেখা না গেলে ৩০ তারিখকে ‘সন্দেহের দিন’ বলা হয়। এই দিন সাওম রাখা নিষেধ। হাদিসে ইরশাদ হয়েছে:

আম্মার ইবনে ইয়াসির (রা:) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, যে ব্যক্তি সন্দেহের দিন সাওম রাখবে সে আবুল কাসেম (রাসূলুল্লাহ (সা:) এর বিরোধিতা করল। (সুনানে তিরমিজি ৬৮১)।

অপর এক হাদিসে ইরশাদ হয়েছে:

আবু হুরাইরা (রা:) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা:) বলেছেন, তোমরা রমজানের পূর্বে একদিন বা দুইদিন অগ্রিম সাওম রাখিও না। তবে যদি কোন ব্যক্তি ঐ দিন সাওম রাখতে অভ্যস্ত হয় তাহলে সে সাওম রাখতে পারবে। (সুনানে আবু দাউদ ২৩৩৭; হাদীসটি সহীহ)।

এ হাদিসেও একদিন আগে চাঁদ দেখা যেতে পারে এই সন্দেহের উপর ভিত্তি করে একদিন বা দুইদিন আগে সাওম রাখতে নিষেধ করা হয়েছে।

(৪) ‘সাওমে দাহার’। নিষিদ্ধ দিবস সমূহ সহ সারা বছর সাওম রাখা। এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সা:) বলেন:

আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা:) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা:) বলেছেন: যে ব্যক্তি সারা বছর সাওম রাখল তার কোন সাওম নাই। (সহীহ বুখারী ১৯৭৯)।

(৫) স্বামী বাড়িতে থাকা অবস্থায় তার অনুমতি ব্যতিত স্ত্রী নফল সাওম রাখা। হাদিসে ইরশাদ হয়েছে:

আবূ হুরাইরা (রা:) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা:) বলেছেন: কোন মহিলা স্বামীর উপস্থিতিতে তার অনুমতি ব্যতিত রমজানের সাওম ছাড়া কোন নফল সাওম রাখবে না। (সহীহ বুখারী ৪৮৯৯, মুসনাদে আহমদ ৭৩৪৩, তিরমিজি ৭৮২)।

(৬) ‘সাওমে বেসাল’ একাধারে কোন প্রকার ইফতার বা রাতের খাবার গ্রহণ করা ছাড়া কয়েকদিন সাওম রাখা। এ ধরণের সাওম আল্লাহর রাসূল (সা:) নিজে রাখতেন তবে উম্মতের জন্য নিষেধ করেছেন। যা নিম্নের হাদীসটিতে কারণসহ উল্লেখ রয়েছে:

আবু হুরাইরা (রা:) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা:) বলেছেন: খবরদার! তোমরা সাওমে বেসাল থেকে বেঁচে থাক। একথাটি তিনি তিনবার বললেন। সাহাবায়ে কেরাম বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি তো ‘বেসাল’ করেন। রাসূলুল্লাহ (সা:) বললেন তোমরা এ ব্যাপারে আমার মতো নও। আমি যখন রাতের বেলায় ঘুমাই তখন আমার রব আমাকে খাওয়ান এবং পান করান। সুতরাং তোমরা যে পরিমাণ আমল করতে সক্ষম সে পরিমাণ দায়িত্ব নাও। (সহীহ বুখারী ১৮৬৫, সহীহ মুসলিম ২৬২২, মুসনাদে আহমদ ৭১৬২)।

সাওম শব্দের অর্থ কি? সাওম কাকে বলে এবং কত প্রকার?

সিয়াম শব্দের অর্থ কি, সাওম শব্দের অর্থ কি, সাওম কাকে বলে, সাওম অর্থ কি, সাওম কত প্রকার, সাওম কি, সাওম কত প্রকার ও কি কি, সাওমের মূল উদ্দেশ্য কি, সাওম শব্দের অর্থ কী, সাওম এর পরিচয়, সিয়াম অর্থ কি, সিয়াম কাকে বলে, রোজা কাকে বলে, রোজা শব্দের বাংলা অর্থ কি, রোজা শব্দের অর্থ কি

রোজা – উইকিপিডিয়া

সাওম শব্দের অর্থ বিরত থাকা

রোজার ফজিলত সম্পর্কে হাদিস. Rojar fojilot Bangla

রোজার ফরজ কয়টি ও কি কি? রোজা রাখার নিয়ম কানুন

রোজার নিয়ত কিভাবে করতে হয়? রোজা রাখার নিয়ত. Rojar niyat

রোজা ভঙ্গের কারণ. রোজা ভাঙার কারণ সমূহ. Roja vonger karon

Similar Posts