রমজান মাসের ফজিলত ও রমজান মাসের গুরুত্ব

রমজান-মাসের-ফজিলত-ও-রমজান-মাসের-গুরুত্ব

রমজান মাসের ফজিলত ও রমজান মাসের গুরুত্ব

বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম; রমজান মাসের ফজিলত: রমজান মাসের আগমনে মুসলিমগণ আনন্দ প্রকাশ করে থাকেন। আনন্দ প্রকাশ করাই স্বাভাবিক স্বতঃস্ফূর্ততা। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন: বল, এটা আল্লাহর অনুগ্রহ ও তাঁর দয়ায়। সুতরাং এতে তারা আনন্দিত হোক। তারা যা সঞ্চয় করে এটা তার চেয়ে উত্তম। 

—সূরা ইউনুস : ৫৮

পার্থিব কোন সম্পদের সাথে আল্লাহর এ অনুগ্রহের তুলনা চলে না, তা হবে এক ধরনের অবাস্তব কল্পনা। 

আমাদের কর্তব্য আল্লাহর এ অনুগ্রহের মূল্যায়ন করতে চেষ্টা করা, এ মাসের ফজিলত ও তাৎপর্য অনুধাবনে সচেষ্ট হওয়া ও ইবাদত বন্দেগী সহ সকল কল্যাণকর কাজে নিয়োজিত থাকা। 

Table of Contents - সূচিপত্র

কুরআন ও হাদিসে রমজানের যেসব ফজিলত ও গুরুত্ব বর্ণনা করা হয়েছে তা হল:

১. রমজান একটি বরকতময় মাস

২. রমজান মাসে রহমতের দরজা সমূহ খুলে দেওয়া হয়

৩. রমজান মাসে আসমানের দরজা সমূহ খুলে দেওয়া হয়

৪. রমজান মাসে জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেয়া হয় ও জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়

৫. রমজান মাসে শয়তানকে বেঁধে রাখা হয়

৬. রমজান মাসের ফরয সিয়ামের মর্যাদা 

৭. রমজান হল কুরআন নাজিলের মাস 

৮. রমজান মাসে রয়েছে লাইলাতুল কদর

৯. রমজান মাস দোয়া কবুলের মাস

১০. রমজান মাস পাপ থেকে ক্ষমা লাভের মাস

১১. রমজান মাস জাহান্নাম থেকে মুক্তি লাভের মাস 

১২. রমজান মাসে সৎকর্মের প্রতিদান বহুগুণে বৃদ্ধি করে দেয়া হয়

১৩. রমজান মাস ধৈর্য ও সবরের মাস 

এক. রমজান একটি বরকতময় মাস

আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ 

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন যে, তোমাদের নিকট রমজান উপস্থিত হয়েছে, যা একটি বরকতময় মাস। তোমাদের উপর আল্লাহ তাআলা অত্র মাসের সাওম ফরজ করেছেন। এ মাস আগমনে জান্নাতের দরজাসমূহ খুলে দেয়া হয়, জাহান্নামের দরজাসমূহ বন্ধ করে দেয়া হয়, আর আল্লাহর অবাধ্য শয়তানদের গলায় লোহার বেড়ী পরানো হয়। এ মাসে একটি রাত রয়েছে যা এক হাজার মাস অপেক্ষাও উত্তম। যে ব্যক্তি সে রাতের কল্যাণ থেকে বঞ্চিত রয়ে গেল সে প্রকৃত বঞ্চিত রয়ে গেল।

—সুনানে আন নাসায়ী হাদিস নং ২১১০

দুই. রমজান মাসে রহমতের দরজা খুলে দেওয়া হয়

আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, 

রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ রমজান মাস উপস্থিত হলে রহমতের দরজাসমূহ উন্মুক্ত করে দেয়া হয়, জাহান্নামের দরজাসমূহ বন্ধ করে দেয়া হয় এবং শাইতানগুলোকে শিকলে আবদ্ধ করা হয়। 

—সহীহ মুসলিম: ২৩৮৬

তিন. রমজান মাসে আসমানের দরজা সমূহ খুলে দেওয়া হয়

আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ

তিনি বলেন, আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ রমযান আসলে আসমানের দরজাসমূহ খুলে দেয়া হয় এবং জাহান্নামের দরজাসমূহ বন্ধ করে দেয়া হয় আর শয়তানগুলোকে শিকলবন্দী করে দেয়া হয়।

—সহীহ বুখারী হাদিস নং ১৮৯৯

চার. রমজান মাসে জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেয়া হয় ও জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়

আবূ হুরায়রাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ

রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ রমাযান মাস আসলে জান্নাতের দরজাসমূহ উন্মুক্ত করে দেয়া হয়। জাহান্নামের দরজাসমূহ বন্ধ করে দেয়া হয় এবং শইতানগুলোকে শিকলে বন্দী করা হয়। 

—সহীহ মুসলিম ২৩৮৫

পাঁচ. রমজান মাসে শয়তানকে বেঁধে রাখা হয়

আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ

রাসুলুল্লাহ্‌ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ যখন রমযান মাস আসে তখন জান্নাতের দরজাসমূহ খুলে দেয়া হয়, জাহান্নামের দরজাসমূহ বন্ধ করে দেয়া হয় আর শয়তানদেরকে বেঁধে রাখা হয়।

—সুনানে আন নাসায়ী: ২০৯৮

তাই শয়তান রমজানের পূর্বে যে সকল স্থানে অবাধে বিচরণ করত রমজান মাস আসার ফলে সে সকল স্থানে যেতে পারে না। শয়তানের তৎপরতা দুর্বল হয়ে যায়। ফলে, দেখা যায় ব্যাপকভাবে মানুষ তওবা, ধর্মপরায়ণতা, ও সৎকর্মের দিকে অগ্রসর হয় ও পাপাচার থেকে দূরে থাকে। তারপরও কিছু মানুষ অসৎ ও অন্যায় কাজকর্মে তৎপর থাকে। কারণ, শয়তানের কু-প্রভাবে তারা অনেক বেশি প্রভাবিত হয়ে পড়েছে।

ছয়. রমজান মাসের ফরয সিয়ামের মর্যাদা

এ মাসের সাথে ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ রুকনের সম্পর্ক রয়েছে। আর তা হলো সিয়াম পালন। হজ্জ যেমন জিলহজ মাসের সাথে সম্পর্কিত হওয়ার কারণে সে মাসের মর্যাদা বৃদ্ধি করেছে এমনি সিয়াম রমজান মাসে হওয়ার কারণে এ মাসের মর্যাদা বেড়ে গেছে। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন :

হে মুমিনগণ! তোমাদের উপর সিয়াম ফরজ করা হয়েছে, যেমনি ফরজ করা হয়েছে তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর যাতে তোমরা মুত্তাকি হতে পার।

—সূরা বাকারা: ১৮৩

রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: ইসলাম যে পাঁচটি ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত তার একটি হল সিয়াম পালন। এ সিয়াম জান্নাত লাভের একটি মাধ্যম ; যেমন হাদীসে এসেছে :

যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আনল, সালাত কায়েম করল, যাকাত আদায় করল, সিয়াম পালন করল রমজান মাসে, আল্লাহ তাআলার কর্তব্য হয়ে যায় তাকে জান্নাতে প্রবেশ করানো।

—সহীহ বুখারী: ৭৪২৩

সাত. রমজান হল কুরআন নাজিলের মাস

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন :

রমজান মাস, এতে নাজিল করা হয়েছে আল কুরআন, যা মানুষের দিশারী এবং

স্পষ্ট নিদর্শন ও সত্যাসত্যের পার্থক্যকারী। 

—সূরা বাকারা: ১৮৫

রমজান মাসে সপ্তম আকাশের লওহে মাহফুজ থেকে দুনিয়ার আকাশের বায়তুল ইজ্জতে পবিত্র আল কুরআন একবারে নাজিল হয়েছে। সেখান থেকে আবার রমজান মাসে অল্প অল্প করে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর প্রতি নাযিল হতে শুরু করে। কুরআন নাযিলের দুটি পর্বই রমজান মাসকে ধন্য করেছে। শুধু আল কুরআনই নয় বরং ইবরাহীম আ.-এর সহীফা, তাওরাত, যবুর, ইঞ্জিল সহ সকল ঐশী গ্রন্থ এ মাসে অবতীর্ণ হয়েছে বলে তাবরানী বর্ণিত একটি সহীহ হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে। 

এ মাসে মানুষের হিদায়াত ও আলোকবর্তিকা যেমন নাযিল হয়েছে তেমনি আল্লাহর রহমত হিসেবে এসেছে সিয়াম। তাই এ দুই নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করতে বেশি বেশি করে কুরআন তিলাওয়াত করা উচিত। প্রতি বছর রমজান মাসে জিবরীল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে পূর্ণ কুরআন শােনাতেন এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও তাকে পূর্ণ কুরআন শােনাতেন। আর জীবনের শেষ রমজানে আল্লাহর রাসূল দু বার পূর্ণ কুরআন তিলাওয়াত করেছেন। সহীহ মুসলিমের হাদীস দ্বারা এটা প্রমাণিত।

আট. রমজান মাসে রয়েছে লাইলাতুল কদর

আল্লাহ তাআলা বলেন :

লাইলাতুল কদর সহস্র মাস অপেক্ষা উত্তম। সে রাতে ফেরেশতাগণ ও রুহ অবতীর্ণ হয় প্রত্যেক কাজে তাদের প্রতিপালকের অনুমতিক্রমে। শান্তিই শান্তি, সে রজনী উষার আবির্ভাব পর্যন্ত।

—সূরা আল-কদর : ৩-৫

নয়. রমজান মাস দোয়া কবুলের মাস

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন :

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন রমজানের প্রতি রাতে ও দিনে বহু মানুষকে মুক্তি দিয়ে থাকেন এবং প্রতি রাত ও দিবসে মুসলিমের দোয়া-প্রার্থনা কবুল করা হয়। তাই প্রত্যেক মুসলমান এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে নিজের কল্যাণের জন্য যেমন দোয়া প্রার্থনা করবে, তেমনি সকল মুসলিমের কল্যাণ, শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য সর্বশক্তিমান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা জ্ঞাপন করবে।

—মাজমুউ মুআল্লাফাতুল আলবানী : ১০০২

দশ. রমজান মাস পাপ থেকে ক্ষমা লাভের মাস

যে ব্যক্তি রমজান মাস পেয়েও তার পাপ সমূহ ক্ষমা করানাে থেকে বঞ্চিত হলাে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে ধিক্কার দিয়েছেন। তিনি বলেছেন :

ঐ ব্যক্তির নাক ধুলায় ধূসরিত হোক যার কাছে রমজান মাস এসে চলে গেল অথচ তার পাপগুলো ক্ষমা করা হয়নি।

—জামেউল উসূল ফি আহাদিসির রাসূল : ১৪১০

সত্যিই সে প্রকৃত পক্ষে সকল কল্যাণ থেকে বঞ্চিত যে এ মাসেও আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের অনুগ্রহ থেকে বঞ্চিত রয়ে গেল। 

এগার. রমজান মাস জাহান্নাম থেকে মুক্তি লাভের মাস

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন :

রমজান মাসের প্রথম রজনীর যখন আগমন ঘটে তখন শয়তান ও অসৎ জিনগুলােকে বন্দি করা হয়। জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়, এ মাসে একটি দরজাও খোলা হয় না। জান্নাতের দরজাসমূহ খুলে দেয়া হয়, এ মাসে তা আর বন্ধ করা হয় না। প্রত্যেক রাতে একজন ঘোষণাকারী এ বলে ঘোষণা দিতে থাকে যে, হে সঙ্কর্মের অনুসন্ধানকারী তুমি অগ্রসর হও! হে অসৎ কাজের অনুসন্ধানকারী তুমি থেমে যাও! এ মাসের প্রতি রাতে আল্লাহ তাআলা জাহান্নাম থেকে বহু মানুষকে মুক্তি দিয়ে থাকেন।

—আস সুনান আস সুগরা : ১৪২৯

বার. রমজান মাসে সৎ কর্মের প্রতিদান বহুগুণে বৃদ্ধি করে দেয়া হয়

যেমন হাদীসে এসেছে যে, রমজান মাসে ওমরাহ করলে একটি হজের সওয়াব পাওয়া যায়। শুধু তাই নয়, বরং, রমজান মাসে ওমরাহ করা আল্লাহর রাসূলের সাথে হজ আদায়ের মর্যাদা রাখে। এমনিভাবে সকল ইবাদত বন্দেগী সহ সকল সৎকাজের প্রতিদান কয়েক গুণ বৃদ্ধি করে দেয়া হয়। 

তের. রমজান ধৈর্য ও সবরের মাস

এ মাসে ঈমানদার ব্যক্তিগণ খাওয়া-দাওয়া, বিবাহ-শাদি ও অন্যান্য সকল আচার আচরণে ধৈর্য ও সবরের এত অধিক অনুশীলন করেন তা অন্য কোন মাসে বা অন্য কোন পর্বে করেন না। এমনিভাবে সিয়াম পালন করে যে ধৈর্যের প্রমাণ দেয়া হয় তা অন্য কোন ইবাদতে পাওয়া যায় না। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন:

ধৈর্যশীলদের তাে বিনা হিসেবে পুরস্কার দেয়া হবে।

—সূরা যুমার: ১০

আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে বিষয়গুলি সঠিকভাবে বুঝার ও রমজানের ফজিলত সমূহ লাভ করার তাওফীক দান করুক। আল্লাহুম্মা আমীন।

রমজানের ফজিলত সম্পর্কে হাদিস, রমজানের ফজিলত ও গুরুত্ব, রমজানের ফজিলত সম্পর্কিত হাদিস, রমজান মাসের ফজিলত, রমজান মাসের ফজিলত ও গুরুত্ব, রমজান মাসের ফজিলত সম্পর্কে হাদিস, রমজান মাসের ফজিলত ও মর্যাদা, রমজান মাসের ফজিলত ও তাৎপর্য, মাহে রমজানের ফজিলত, মাহে রমজানের ফজিলত ও গুরুত্ব, পবিত্র মাহে রমজানের ফজিলত, রমজান মাসে শয়তানকে বেঁধে রাখা হয়, ramadan fazilat bangla, 

মন্তব্য করুন

Top
Don`t copy text!