শবে বরাত কুরআনে

বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম


শবে বরাত কুরআনে


কোরআনের আলোকে শবে বরাত, শবে বরাত কুরআনে, 


শবে বরাত বা লাইলাতুল বারাআত পরিভাষা কুরআন কারীমে কোথাও ব্যবহৃত হয়নি। লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান বা মধ্য শাবানের রজনী পরিভাষাটিও কুরআন কারীমে কোথাও ব্যবহৃত হয়নি। তবে কুরআন কারীমের একটি আয়াতের ব্যাখ্যায় মুফাসিরগণ শবে বরাত প্রসঙ্গ আলােচনা করেছেন। 

মহান আল্লাহ বলেন: আমি তাে তা অবতীর্ণ করেছি এক মুবারক (বরকতময়) রজনীতে এবং আমি তাে সতর্ককারী। এ রজনীতে প্রত্যক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্থিরীকৃত হয়।


মুবারক রজনীর ব্যাখ্যায় বিভিন্ন সাহাবী ও তাবিয়ী বলেছেন যে, এ রাতটি হলাে লাইলাতুল ক্বদর বা মহিমান্বিত রজনী। সাহাবীগণের মধ্য থেকে ইবনু আব্বাস (রা) ও ইবনু উমার (রা) থেকে অনুরূপ ব্যাখ্যা বর্ণিত হয়েছে। তাবেয়ীগণের মধ্য থেকে আবু আব্দুর রহমান আল-সুলামী (৭৪ হি), মুজাহিদ বিন জাবুর (১০২ হি), হাসান বসরী (১১০ হি), ক্বাতাদা ইবনু দিআমা (১১৭ হি) ও আব্দুর রহমান বিন যায়েদ বিন আসলাম (১৮২ হি) বিশেষ ভাবে উল্লেখযােগ্য। তারা সকলেই বলেছেন যে, লাইলাতুম মুবারাকাহ অর্থ লাইলাতুল ক্বদর।

এ সকল সাহাবী-তাবিয়ীর মতের বিপরীতে একজন তাবিয়ী মত প্রকাশ করেছেন যে, এ আয়াতে বরকতময় রাত্রি বলতে শবে বরাত বুঝানাে হয়েছে । সাহাবী ইবনু আব্বাস (মৃ. ৬৮ হি)-এর খাদেম তাবিয়ী ইকরিমাহ (মৃ. ১০৪ হি) বলেন, এখানে মুবারক রজনীবলতে মধ্য শাবানের রাতকে বুঝানাে হয়েছে । ইকরিমাহ বলেন, এই রাতে গােটা বছরের সকল বিষয়ে ফয়সালা করা হয়।

অধিকাংশ বর্ণনাকারী এ বক্ত্যবটি ইকরিমার বক্তব্য হিসেবে বর্ণনা করেছেন। দ্বিতীয় হিজরী শতকের একজন বর্ণনাকারী বক্তব্যটি ইবনু আব্বাসের বক্তব্য বলে উল্লেখ করেছেন। আন-নাদর বিন ইসমাঈল (১৮২ হি) নামক একব্যক্তি বলেন, তাকে মুহাম্মদ বিন সুক্কা বলেছেন, তাকে ইকরিমাহ বলেছেন ইবনু আব্বাস থেকে, তিনি উপরে উল্লিখিত আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন: মুবারক রজনী হলাে মধ্য-শাবানের রাত। এতে মৃত্যু বরণকারীদের নাম বর্ণনা করা হয়, হাজ্বীদের তালিকা তৈরি হয়, অতঃপর কোনাে বাড়তি-কমতি করা হয়না।

এ সনদের রাবী আন নাদ ইবনু ইসমাঈল (১৮২ হি) কুফার একজন গল্পকার ওয়ায়েয ছিলেন। তিনি ব্যক্তিগত ভাবে সৎ হলেও হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে তার ভুলের কারণে মুহাদ্দিসগণ তাকে দুর্বল আখ্যা দিয়েছেন। আবুল হাসান ইজলি বলেছেন, এ ব্যক্তি বিশ্বস্ত। ইয়াহয়িয়া বিন সাঈদ বলেছেন, সে একেবারেই অগ্রহণযােগ্য ও মূল্যহীন । ইমাম নাসায়ী ও আবু যুর আ বলেছেন, সে শক্তিশালী বা গ্রহণযােগ্য নয়। ইয়াহয়িয়া বিন মাঈন বলেছেন: নাদর বিন ইসমাঈল সত্যবাদী তবে সে কি বর্ণনা করে তা নিজেই জানে না। ইমাম বুখারী ইমাম আহমদের বরাত দিয়ে বলেন, এ ব্যক্তি সনদ মুখস্থ রাখতে পারত না। ইবনু হিব্বান বলেন, তার ভুল খুব মারাত্মক, যে কারণে তিনি পরিত্যক্ত বলে গণ্য হয়েছেন।

আন-নাদ ইবনু ইসমাঈলের অবস্থা অবলােকন করলে আমরা বুঝতে পারি যে, তিনি ভুল বশত ইকরিমার বক্তব্যকে ইবনু আব্বাসের বক্তব্য হিসাবে বর্ণনা করেছেন। তিনি সম্ভবত মুহাম্মাদ ইবনু সূকাকে বলতে শুনেছেন ইবনু আব্বাসের মাওলা ইকরিমা থেকে। তিনি ভুলে বলেছেন ইকরিমা থেকে, ইবনু আব্বাস থেকে। এভাবে মাকতু হাদীস বা তাবিয়ীর বক্তব্য মাওকুফ বা সাহাবীর বক্তব্যে পরিণত হয়েছে। ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বস্ত অনেক রাবীই স্মৃতির দুর্বলতা, নিয়মিত চর্চা ও পাণ্ডুলিপি সংরক্ষণের অভাবে এভাবে অনেক সময় মাকতু হাদীসকে মাওকুফ বা মাওকুফ হাদীসকে মারফু রূপে বর্ণনা করেছেন। অন্যান্য রাবীদের বর্ণনার সাথে তুলনামূলক নিরীক্ষার মাধ্যমে মুহাদ্দিসগণ এ সকল ভুল নির্ধারণ করেছেন ।

উপরের আলােচনা থেকে আমরা বুঝতে পারি, তাবিয়ী ইকরিমা থেকে প্রমাণিত হয়েছে যে, তিনি সূরা দুখানে উল্লিখিত মুবারক রজনী বলতে মধ্য শাবানের রজনী বুঝতেন।

উল্লেখ্য যে, মুফাসসিরগণ ইকরিমার এ মত গ্রহণ করেন নি। প্রসিদ্ধ মুফাসিরদের মধ্যে কেউই ইকরিমার এ মত গ্রহণ করেন নি। কোনাে কোনাে মুফাসসির দুটি মত উল্লেখ করেছেন এবং কোনােটিরই পক্ষে কিছু বলেন নি। আর অধিকাংশ মুফাসসির ইকরিমার মতটি বাতিল বলে উল্লেখ করেছেন এবং অন্যান্য সাহাবী-তাবিয়ীর মতটিই সঠিক বলে গ্রহণ করেছেন। তারা বলেন যে, সঠিক মত হলাে, এখানে মুবারক রজনী বলতে লাইলাতুল ক্বাদরকে বুঝানাে হয়েছে। মহান আল্লাহ যে রাত্রিতে কুরআন কারীম অবতীর্ণ করেছেন সে রাত্রিকে এক স্থানে লাইলাতুল ক্বাদর বা মহিমান্বিত রজনীবলে অভিহিত করেছেন। অন্যত্র এ রাত্রিকেই লাইলাতুম মুবারাকাবা বরকতময় রজনীবলে অভিহিত করেছেন। এবং এ রাত্রিটি নিঃসন্দেহে রামাদান মাসের মধ্যে; কারণ অন্যত্র আল্লাহ ঘােষণা করেছেন যে, তিনি রামাদান মাসে কুরআন নাযিল করেছেন। এথেকে প্রমাণিত হয় যে, মুবারক রজনী রামাদান মাসে, শাবান মাসে নয়। তাদের মতে লাইলাতুম মুবারাকাএবং লাইলাতুল ক্বাদরএকই রাতের দুটি উপাধি।

এ সকল মুফাসসিরের মধ্যে রয়েছেন মুহাম্মাদ ইবনু জারীর তাবারী (মৃ. ৩১০ হি), আবু জাফর আহমদ ইবনু মুহাম্মদ আন-নাহহাস (৩৩৮ হি), আবুল কাসেম মাহমুদ ইবনু উমর আয-যামাখশারী (৫৩৮ হি), ইবনুল আরাবী, আবু বকর মুহাম্মদ ইবনু আব্দুল্লাহ (৫৩৪ হি), আবু মুহাম্মদ আব্দুল হক ইবনু আতিয়্যা (৫৪৬ হি), আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনু আহমদ আল-কুরতুবী (৬৭১ হি), আবু হাইয়্যান মুহাম্মদ ইবনু ইউসুফ গারনাতী (৭৫৪ হি), ইসমাঈল ইবনু উমার আবুল ফিদা, ইবনু কাসীর (৭৭৪ হি), আবুস সাউদ মুহাম্মদ ইবনু মুহাম্মদ আল ইমাদী (৯৫১ হি), মুহাম্মদ ইবনু আলী আল শাওকানী (১২৫০ হি), সাইয়্যেদ মাহমুদ আলুসী (১২৭০ হি), আশরাফ আলী থানবী (১৩৬২ হি), মুহাম্মদ আমীন আল-শানকৃতী (১৩৯৩ হি), মুফতী মুহাম্মদ শফী, মুহাম্মদ আলী আল-সাবুনী প্রমুখ।

ইমাম মুহাম্মাদ ইবনু জারীর তাবারী বিভিন্ন সনদে ইকরিমার এ ব্যাখ্যা উদ্ধৃত করার পরে তার প্রতিবাদ করেছেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন:
সঠিক মত হলাে তাদের মত যারা বলেছেন যে, লাইলাতুম মুবারাকা বা বরকতময় রাত্রি হলাে লাইলাতুল কদর বা মর্যাদার রাত্রি।

অতঃপর তিনি বলেন যে, বরকতময় রাত্রির ব্যাখ্যার ভিত্তিতে প্রত্যেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ফয়সালার বিষয়েও আলিমগণ মতভেদ করেছেন। অনেকে বলেছেন, এ হলাে লাইলাতুল কদর”, এ রাত্রিতেই পরবর্তী বছরের জন্ম, মৃত্যু, উন্নতি, অবনতি ও অন্যান্য বিষয় নির্ধারণ করা হয় । হাসান বসরী, কাতাদা, মুজাহিদ, আবু আব্দুর রাহমান আস-সুলামী, উমার মাওলা গাফরা, আবূ মালিক, হিলাল ইবনু ইয়াসাফ প্রমুখ তাবিয়ী-তাবি-তাবিয়ী থেকে উদ্ধৃত করেন যে, এদের সকলের মতেই লাইলাতুল কদরে এ সকল বিষয়ের ফয়সালা করা হয়। এরপর তিনি ইকরামা থেকে উদ্ধৃত করেন যে, তার মতে লাইলাতুন নিসফি মিন শাবানে এ সকল বিষয়ের ফয়সালা করা হয়। 

অতঃপর তিনি বলেন: এতদুভয়ের মধ্যে সঠিকতর মত হলাে যারা বলেছেন যে, লাইলাতুল কাদরে এ সকল বিষয়ের ফয়সালা হয়; কারণ আমরা বলেছি যে, এখানে লাইলাতুম মুবারাকা বলতে তাে লাইলাতুল কাদরকেই বুঝানাে হয়েছে।

এ বিষয়ে আল্লামা আবু বাকর ইবনুল আরাবী (মৃত্যু ৫৪৩ হি) বলেন: অধিকাংশ আলিম বলেছেন যে, লাইলাতুম মুবারাকা বা বরকতময় রজনী হলাে লাইলাতুল কাদর। কেউ কেউ বলেছেন, তা হলাে মধ্যশাবানের রজনী। এ মতটি বাতিল; কারণ মহান আল্লাহ তার সন্দেহাতীভাবে সত্য গ্রন্থে বলেছেন: রামাদান মাস যার মধ্যে কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে। এ কথাটি দ্ব্যর্থহীনভাবে জানাচ্ছে যে, কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার সময় রামাদান মাস। অত জানিয়ে বলা হয়েছে বরকতময় রাত্রিতে। কাজেই কেউ যদি মনে করে যে, এ বরকতময় রাত্রিটি রামাদান ছাড়া অন্য কোনাে মাসে তাহলে সে আল্লাহর নামে মহা মিথ্যা বানিয়ে বললাে।

আল্লামা কুরতুবী (৬৭১হি) বলেন: লাইলাতুম মুবারাকা অর্থাৎ বরকতময় রজনী হলাে লাইলাতুল ক্বাদর। ইকরিমাহ বলেছেন, এখানে বরকতময় রজনী বলতে মধ্য-শাবানের রজনী বুঝানাে হয়েছে। প্রথম মতটিই সঠিকতর।

আল্লামা ইবনু কাসীর (৭৭৪ হি) নিশ্চিত করেন যে, বরকমতয় রজনী বলতে লাইলাতুল কাদরই বুঝানাে হয়েছে। অতঃপর তিনি বলেন: ইকরিমাহ থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, বরকতময় রাত্রিটি শাবানের মধ্যম রজনী। এমতটি একটি অসম্ভব ও অবাস্তব মত। কারণ কুরআনে দ্ব্যর্থহীনভাবে বলা হয়েছে যে, এ রাত্রটি রামাদানের মধ্যে।

আল্লামা আশরাফ আলী থানবী (১৩৬২ হি) বলেন: অধিকাংশ তাফসিরকারকই লাইলাতুম মুবারাকাকে এখানে শবে ক্বাদর বলিয়া তাফসীর করিয়াছেন এবং এ সম্মন্ধে হাদীসও যথেষ্ট রহিয়াছে। আর কেহ কেহ লাইলাতুম মুবারাকা এর তাফসীর করিয়াছেন শবে বরাত। কেননা শবে বরাত সম্মন্ধেও বহু হাদীস বর্ণিত হইয়াছে যে, শবে বরাতে বৎসরের যাবতীয় কার্যের মীমাংসা হইয়া থাকে । কিন্তু যেহেতু শবে বরাতে কোরআন নাযিল হইয়াছে বলিয়া কোনাে রেওয়ায়াত নাই এবং শবে ক্বদরে নাযিল হইয়াছে বলিয়া স্বয়ং কোরআনের নিশ্চয় আমি তা লাইলাতুল কাদরে অবতীর্ণ করেছিআয়াতেই উল্লেখ রহিয়াছে; সেই হেতু শবে বরাত বলিয়া লাইলাতুম মুবারাকা-এর তাফসীর করা শুদ্ধ নহে বলিয়া মনে হয়।

ইকরিমার মতটি প্রত্যাখ্যানের বিষয়ে মুফাসসিরগণের এরূপ ঐকমত্যের কারণ হলাে, ইকরিমার এ মতটি কুরআনের স্পষ্ট বাণীর সাথে সাংঘর্ষিক। কারণ কুরআনে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে, আল্লাহ রামাদান মাসে কুরআন নাযিল করেছেন। অন্যত্র বলা হয়েছে যে, একটি মুবারক রাত্রিতে ও একটি মহিমান্বিত রাত্রিতে তিনি কুরআন নাযিল করেছেন। এ সকল আয়াতের সমন্বিত স্পষ্ট অর্থ হলাে, আল্লাহ রামাদান মাসের এক রাত্রিতে কুরআন নাযিল করেছেন এবং সে রাত্রটি বরকতময় ও মহিমান্বিত। মুবারক রজনীর ব্যাখ্যায় মধ্য শাবানের রজনীর উল্লেখ করার অর্থ হলাে এই আয়াতগুলির স্পষ্ট অর্থ বিভিন্ন অপব্যাখ্যা ও ঘােরপ্যাচের মাধ্যমে বাতিল করা।

মন্তব্য করুন

Top
Don`t copy text!