You are here

কোরবানির ইতিহাস ফজিলত মাসায়েল

বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম

কোরবানির-ইতিহাস।-কুরবানীর-মাসায়েল।-কোরবানির-দোয়া

কোরবানির ইতিহাস ফজিলত মাসায়েল

কুরবানী অর্থ কি

আরবী কুরবান শব্দটি ফারসী বা উর্দুতে কুরবানী রূপে  পরিচিত হয়েছে, যার অর্থ নৈকট্য। আর কুরবান শব্দটি কুরবাতুন শব্দ থেকে উৎপন্ন। আরবী কুরবাতুন  এবং কুরবান উভয় শব্দের শাব্দিক অর্থ নিকটবর্তী হওয়া, কারো নৈকট্য লাভ  করা প্রভৃতি। ইসলামী পরিভাষায় আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের নৈকট্য অর্জনের জন্য নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে যে পশু যবেহ করা হয় তার নামই কুরবান বা কুরবানী।

আল কোরআনে  কুরবান  শব্দটি তিন  জায়গায় ব্যবহৃত হয়েছে। আর হাদিসে  কুরবান শব্দের পরিবর্তে উযহিয়্যাহ এবং  যাহিয়্যাহ শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। উযহিয়্যাহ কুরবানীর  দিনসমূহে আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের উদ্দেশ্যে যবেহযোগ্য উট, গরু, ছাগল বা ভেড়াকে বলা হয়। এ শব্দটি যুহা শব্দ থেকে গৃহীত যার অর্থ পূর্বাহ্ন। যেহেতু  কুরবানী যবেহ  করার উত্তম সময় হল ১০ যিলহজ্জের অর্থাৎ ঈদের দিনের পূর্বাহ্নকাল তাই ঐ সামঞ্জস্যের জন্য তাকে উযহিয়্যাহ বলা হয়েছে। এটিকে আবার যাহিয়্যাহ বা আযহাহও বলা হয়। আর আযহাহ এর বহুবচন আযহা যার সাথে সম্পর্ক জুড়ে ঈদের নাম হয়েছে ঈদুল আযহা।

পৃথিবীর সর্বপ্রথম কুরবানী

কুরবানীর ইতিহাস খুবই  প্রাচীন। সেই আদি পিতা আদম (আ) এর যুগ থেকেই কুরবানীর বিধান চলে আসছে। আদম (আ) এর দুই ছেলে হাবীল ও কাবীলের কুরবানী পেশ করার কথা আমরা মহাগ্রন্থ আল কোরআন থেকে জানতে পারি।

মহান আল্লাহ বলেন,

আদমের দুই পুত্রের বৃত্তান্ত তুমি তাদেরকে  যথাযথভাবে শুনিয়ে দাও যখন তারা উভয়ে কুরবানী নিবেদন করেছিল তখন একজনের কুরবানী কবুল হল এবং অন্যজনের  কুরবানী কবুল  হল না। তাদের একজন বলল, আমি তোমাকে অবশ্যই হত্যা করব। অপরজন বলল আল্লাহ তো সংযমীদের কুরবানীই কবুল করে থাকেন। (সূরা মায়িদা:-২৭)

ইব্রাহীম (আ) এর কুরবানী

ইব্রাহীম (আ.)এর কুরবানী থেকেই মূলত আমাদের উপর কুরবানী ওয়াজীব করা হয়েছে; (ইব্রাহিম আমার কাছে দোয়া করল) হে আমার পালনকর্তা তুমি আমাকে এক সৎকর্মশীল পুত্র সন্তান দান কর; অতঃপর আমি তাকে এক অতি ধৈরযশীল পুত্রের সুসংবাদ দিলাম; অতঃপর সে যখন তার পিতার সাথে চলাফিরা করার বয়সে পৌঁছল; তখন ইব্রাহীম বলল বৎস আমি স্বপ্নে দেখেছি যে; আমি তোমাকে যবেহ করছি; এখন বল তোমার অভিমত কি? সে বলল; হে পিতা আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে আপনি তাই করুন; আল্লাহ চাইলে আপনি আমাকে ধৈরযশীলই পাবেন।

দুজনেই যখন আনুগত্যে মাথা নুইয়ে দিলো; আর ইব্রাহীম তাকে কাত করে শুইয়ে দিলো; তখন আমি তাকে ডাক দিলাম; হে ইব্রাহীম !স্বপ্নে দেয়া আদেশ তুমি সত্যে পরিণত করেই ছাড়লে। এভাবেই আমি সৎকর্মশীলদেরকে প্রতিদান দিয়ে থাকি; অবশ্যই এটা ছিল একটি সুস্পষ্ট পরীক্ষা; আমি এক মহান কুরবানীর বিনিময়ে পুত্রটিকে ছাড়িয়ে নিলাম; আর আমি তাকে পরবর্তীদের মাঝে স্মরণীয় করে রাখলাম;  ইব্রাহীমের উপর শান্তি বর্ষিত হোক! সৎকর্মশীলদেরকে আমি এভাবেই প্রতিদান দিয়ে থাকি; সে ছিল আমার মুমিন বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত। (সূরা আস সাফফাত:১০০-১১১)

কোরবানির উদ্দেশ্য

পশু নিবেদন বা যবেহ করার উদ্দেশ্য হল এক আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করা, তাকে সন্তুষ্ট করা অর্থাৎ তার ইবাদাত করা।  আর আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন তার ইবাদাত করার জন্য। যেমন তিনি বলেছেন,

আমি জিন ও মানুষকে এজন্য সৃষ্টি করেছি যে, তারা শুধু আমার ইবাদাত করবে। (সূরা আয -যারিয়াত : ৫৬)

ইবাদাত হল তাওহীদ অর্থাৎ আল্লাহর একত্ববাদকে মান্য করে চলার নাম; তাই পশুর রক্ত প্রবাহিত করার মাধ্যমে আমরা আল্লাহর একত্ববাদের সাক্ষী দেই; যেমনটি ইব্রাহীম (আ) করেছিলেন এবং হাবিল করেছিলেন।

কোরবানির বিধান

কুরবানী বিধেয় হওয়ার ব্যাপারে সকল মুসলিম একমত। এ ব্যাপারে কোন দ্বিমত নেই। তবে কুরবানীর হুকুম কি? ওয়াজীব না সুন্নাত? এ বিষয়ে ইমাম ও ফকীহদের মাঝে দুটো মত রয়েছে।

প্রথম মত – কুরবানী ওয়াজীব। ইমাম আওযায়ী, ইমাম লাইস, ইমাম আবু হানিফা, ইমাম মালেক, ইমাম আহমাদ (র) প্রমুখের মত এটাই।

দ্বিতীয় মত – কুরবানী সুন্নতে মুয়াক্কাদাহ; এটা অধিকাংশ উলামাদের মত; ইমাম মালেক ও ইমাম শাফেয়ী (র) এর প্রসিদ্ধ মত এটি; কিন্তু এ মতের প্রবক্তারা আবার বলেছেন সামর্থ্য থাকা অবস্থায় কুরবানী পরিত্যাগ করা মাকরুহ; যদি কোন জনপদের লোকেরা সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও সম্মিলিতভাবে কুরবানী পরিত্যাগ করে; তবে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা হবে; কেননা কুরবানী হল ইসলামের একটি মহান নিদর্শন।

যারা কুরবানী ওয়াজীব বলেন তাদের দলিল-

১.আল্লাহ তায়ালা নির্দেশ দিয়েছেন –

তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে সালাত আদায় কর ও পশু যবেহ কর।(সুরা কাওসার:২)

আর আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের নির্দেশ পালন ওয়াজিব হয়ে থাকে।

২. রাসুল (স) বলেছেন –

যে ব্যক্তি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কুরবানী করে না সে যেন আমাদের ঈদগাহের ধারে না আসে।(মুসনাদ আহমাদ, হাকেম, ইবনে মাজাহ)

যারা কুরবানী পরিত্যাগ করে তাদের প্রতি এ হাদিস একটি সতর্কবাণী। তাই কুরবানী ওয়াজীব।

৩. রাসুল (স) বলেছেন-

হে মানব সকল! প্রত্যেক পরিবারের দায়িত্ব হল প্রতি বছর কুরবানী দেয়া।(মুসনাদে আহমাদ, ইবনে মাজাহ)

যারা কুরবানী সুন্নাত বলেন তাদের দলিল-

১.রাসুল (স) বলেছেন-

তোমাদের মাঝে যে কুরবানী করতে চায়; যিলহজ্জ মাসের চাঁদ দেখার পর সে যেন কুরবানী সম্পন্ন করার আগে তার কোন চুল ও নখ না কাটে।

সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৯৭৭।

এ হাদিসে রাসুল (স) এর ‘যে কুরবানী করতে চায়’ কথা দ্বারা বুঝা যায় এটা ওয়াজীব নয়।

২.রাসুল (স) তার উম্মতের মাঝে যারা কুরবানী করেনি তাদের পক্ষ থেকে কুরবানী করেছেন; তার এ কাজ দ্বারা বুঝে নেয়া যায় যে; কুরবানী ওয়াজিব নয়।

ফায়সালা

আমার মতে কুরবানী ওয়াজিব হওয়ার মতটিই সঠিক; কারন আল্লাহ তায়ালা রাসুল (স) কে নির্দেশ দিয়েছেন কুরবানী পেশ করতে; এবং রাসুল (স) আমাদেরকে কুরবানীর তাকিদ দিয়েছেন ও সতর্কবাণী পেশ করেছেন।

অপরদিকে, কুরবানী সুন্নাত হওয়ার ব্যাপারে যে দুইটি দলিল পেশ করা হয়েছে; তার প্রথমটিতে বলা হয়েছে; রাসুল (স) বলেছেন- তোমাদের মাঝে যে কুরবানী করতে চায়; যিলহজ্জ মাসের চাঁদ দেখার পর সে যেন কুরবানী সম্পন্ন করার আগে তার কোন চুল ও নখ না কাটে; আসলে এই হাদিসে কুরবানীর বিধান বর্ণনা করা মূল উদ্দেশ্য নয়; বরং মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে যিলহজ্জ মাসের শুরু থেকে কুরবানী সম্পন্ন করা পর্যন্ত নির্দিষ্ট একটি আমলের কথা বর্ণনা করা; কুরবানী করা বা না করা, কুরবানী কে করবে বা কে না করবে এটা আলোচ্য বিষয় নয়; আলোচ্য বিষয় ঐ নির্দিষ্ট আমল; আর সবার কুরবানী পেশ করার  সামর্থ্য থাকে না, থাকলেও সবাই করে না , যে কুরবানী পেশ করার ইচ্ছা করছে সে যেন ঐ নির্দিষ্ট আমলটি করে, হাদিসের মূল আলোচনা এটাই; অতএব এই হাদিস দ্বারা কুরবানীর বিধানের দলিল দেয়া যায় না।

আর দ্বিতীয় দলিলে বলা হয়েছে,

রাসুল (স) তার উম্মতের মাঝে যারা কুরবানী করেনি তাদের পক্ষ থেকে কুরবানী করেছেন।  এখানে যারা সামর্থ্য না থাকার কারনে দেয়নি আর রাসুল (স) তাদের পক্ষ থেকে কুরবানী দিয়েছেন যদি এমনটা হয়ে থাকে তবে এটা কুরবানীর বিধানের দলিল হয় না কারন যাদের সামর্থ্য নেই তাদের উপর বিধান নেই।

আর যদি এমনটাই হবে যে; রাসুল (স) তাদের পক্ষ থেকে কুরবানী করেছেন যারা সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কুরবানী করেনি; তাহলে তিনি তাদেরকে ঈদগাহে আসতে নিষেধ করলেন কেন; যেমনটি ঈদগাহে আসতে নিষেধ করেছেন তাদেরকে যারা রামাযানের একমাস সিয়াম পালন না করবে। অতএব যাদের সামর্থ্য আছে; কুরবানী পেশ করা তাদের উপর ওয়াজিব; এই মতটিই সঠিক। তাই যারা কুরবানীর বিধান শিথিল মনে করেন বা ঐচ্ছিক মনে করেন; তারা এই ধারণা ছুড়ে ফেলে দিয়ে কুরবানী পেশ করার জন্য প্রস্তুত হয়ে যান; ঈদুল আযহার দিনে সর্বউত্তম ইবাদাত হল কুরবানী পেশ করা; অর্থাৎ পশুর রক্ত প্রবাহিত করা।

কুরবানী বিশুদ্ধ হওয়ার শর্তাবলী

কুরবানী পেশ করা একটি ইবাদাত; আর ইবাদাত তখনই আল্লাহর নিকটে গ্রহণযোগ্য হবে; যখন সেটা আসলেই ইবাদাত হবে; ইবাদাত যদি হয় ইবাদাতের মতো তবেই তা গ্রহণযোগ্য হবে; আর যদি তা হয় অন্য কিছুর মতো তবে তা কি করে কবুল হবে; অতএব ইবাদাত কি সেটা খুব ভালভাবে বুঝতে হবে; তবেই আপনি ইবাদাত করতে পারবেন এবং তা কবুল হবে ইনশাআল্লাহ।

কোরবানির পশু কেমন হবে

১.ছয় প্রকার পশু কুরবানী করা যায় আর তা হল উট, গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া, দুম্বা। এর মধ্যে সর্বউত্তম হল শিংওয়ালা সাদাকালো দুম্বা।

২.কুরবানীর পশু নির্দিষ্ট বয়সের হতে হবে। উট পাঁচ বছর,গরু বা মহিষ দুই বছর, ছাগল, ভেড়া, দুম্বা এক বছর বয়সের হতে হবে। অবশ্য অসুবিধার ক্ষেত্রে ছয় মাস বয়সী মেষ কুরবানী করা যেতে পারে।

৩.কুরবানীর পশু যাবতীয় দোষত্রুটি মুক্ত হতে হবে। যেমন হাদিসে এসেছে-

সাহাবী বারা ইবনে আযেব (রা) বলেন, রাসুল (স) আমাদের মাঝে দাঁড়ালেন তারপর বললেন, চার ধরনের পশু দিয়ে কুরবানী জায়েয হবে না। অন্ধ. যার অন্ধত্ব স্পষ্ট, রোগাক্রান্ত. যার রোগ স্পষ্ট,পঙ্গু. যার পঙ্গুত্ব স্পষ্ট এবং আহত. যার কোন অঙ্গ ভেঙে গেছে। –তিরমিযী।

কুরবানী করার নিয়মাবলি

১.কুরবানীর জন্য পশু পূর্বেই নির্ধারণ করতে হবে।

২.নির্ধারিত পশু অন্য কোন কাজে ব্যবহার করা যাবে না, দান করা যাবে না, বিক্রি করা যাবে না। যেহেতু যা আল্লাহর জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে তার ক্রয়-বিক্রয় বৈধ নয়। তবে কুরবানী ভালভাবে আদায় করার জন্য তার চেয়ে উত্তম পশু দ্বারা পরিবর্তন করা যাবে।

৩.যদি পশুর মালিক ইন্তেকাল করেন তবে তার ওয়ারিশদের দায়িত্ব হল এ কুরবানী বাস্তবায়ন করা। তার ওয়ারিশগণ তা যবেহ করে নিজেরা খাবে, দান করবে ও উপটৌকন দিবে।

৪.নির্ধারিত পশুর থেকে কোন ধরনের উপকার ভোগ করা যাবে না।

যেমন- দুধ বিক্রি করতে পারবে না, কৃষিকাজে ব্যবহার করতে পারবে না, পশম বিক্রি করা যাবে না।

৫.কুরবানী দাতার অবহেলা বা অযত্নের কারনে যদি পশুটি ত্রুটিযুক্ত হয়ে পড়ে বা হারিয়ে যায় তবে তার কর্তব্য হবে অনুরূপ বা তার চেয়ে ভাল একটি পশু ক্রয় করা। আর যদি অবহেলা বা অযত্নের কারনে ত্রুটিযুক্ত না হয়ে অন্য কারনে হয় তবে ঐ পশুই কুরবানী করলে চলবে।

৬.যদি পশুটি হারিয়ে যায় বা চুরি হয়ে যায় আর কুরবানী দাতার উপর পূর্ব থেকেই কুরবানী ওয়াজিব হয়ে থাকে তাহলে সে কুরবানীর দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি লাভ করবে। আর যদি পূর্ব থেকে ওয়াজিব ছিল না কিন্তু সে কুরবানীর নিয়তে পশু কিনে ফেলেছে তাহলে চুরি হয়ে গেলে বা মরে গেলে অথবা হারিয়ে গেলে তাকে আবার পশু কিনে কুরবানী করতে হবে।

৭.কুরবানীর পশুর কোন অংশ বিক্রয় করা বৈধ হবে না কারন তা আল্লাহর উদ্দেশ্যে নিবেদিত বস্তু। তবে চামড়া বিক্রি করা যেতে পারে কিন্তু টাকা গরিবদেরকে দান করতে হবে। পশুর কোন অংশ দ্বারা কসাইকে পারিশ্রমিক দেয়া বৈধ নয়। যেহেতু সেটাও এক প্রকার বিনিময় যা ক্রয়-বিক্রয়ের মতো। সহীহ বুখারি, সহীহ মুসলিম। তার পারিশ্রমিক আলাদাভাবে প্রদান করতে হবে। অবশ্য কসাই গরিব হলে দান স্বরূপ গরিব না হলে হাদিয়া স্বরূপ তাকে কুরবানীর গোশত দেওয়া যায়।

৮.পশু ক্রয় করার পর যদি বাচ্চা হয়, তবে মায়ের সাথে তাকেও কুরবানী করতে হবে-তিরমিযী। এবং এর পূর্বে ঐ পশুর দুধ খাওয়া যাবে তবে শর্ত হল যেন ঐ বাচ্চা ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। (বাইহাকী)

কোরবানির ওয়াক্ত বা সময়

কুরবানী নির্দিষ্ট সময়ের সাথে সম্পর্কিত একটি ইবাদাত। এ সময়ের পূর্বে যেমন কুরবানী আদায় হবে না তেমনি পরে করলেও আদায় হবে না। অবশ্য কাজা হিসাবে আদায় করলে ভিন্ন কথা। যারা ঈদের সালাত আদায় করবেন তাদের জন্য কুরবানীর সময় শুরু হবে ঈদের সালাত আদায় করার পর থেকে। যদি ঈদের সালাত আদায়ের পূর্বে কুরবানীর পশু যবেহ করা হয় তাহলে কুরবানী আদায় হবে না। আর কুরবানীর সময় শেষ হবে ‍যিলহজ্জ মাসের তেরো তারিখ সূর্যাস্তের সাথে সাথে। অতএব কুরবানীর পশু যবেহ করার সময় হল চারদিন, যিলহজ্জ মাসের দশ, এগার, বার, ও তেরো তারিখ।

মৃত ব্যক্তির পক্ষে কুরবানী

মূলত কুরবানী যথাসময়ে জীবিত ব্যক্তির তরফ থেকেই হওয়া উচিত। অবশ্য ইচ্ছা করলে তার সওয়াবে জীবিত অথবা মৃত আত্মীয়-স্বজনকেও শরিক করতে পারে। যেহেতু আমরা দেখি রাসুল (স) ও তার সাহাবীগণ নিজেদের ও পরিবার পরিজনদের তরফ থেকে কুরবানী করতেন। তবে আলাদাভাবে মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে কুরবানী করা বৈধ নয়। এর পক্ষে কোন সহীহ হাদিস নেই।

নিজের ও পরিবারবর্গের পক্ষ থেকে কুরবানী

নিজ ও পরিবারবর্গের পক্ষ থেকে কুরবানী করতে হবে। আয়েশা (রা) ও আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত যে, রাসুল (স) যখন কুরবানী দিতে ইচ্ছা করলেন তখন দুটো দুম্বা ক্রয় বরলেন। যা ছিল বড় হৃষ্টপুষ্ট, শিংওয়ালা, সাদাকালো বর্ণের এবং খাসি। একটি তিনি তার ঐ সকল উম্মতের জন্য কুরবানী করলেন যারা আল্লাহর একত্ববাদ ও তার রাসুলের রিসালাতের সাক্ষ্য দিয়েছে। অন্যটি তার নিজের ও পরিবারবর্গের জন্য কুরবানী করেছেন। (ইবনে মাজাহ)

নিজের ও পরিবারের পক্ষ থেকে একটি পশুই যথেষ্ট

এ বিষয়ে বর্ণিত হাদিসে মা আয়েশা (রা) বলেন, রাসুল (স) একটি শিংওয়ালা সুন্দর সাদাকালো দুম্বা আনতে বললেন, অতঃপর এ দুআ পড়লেন-

আল্লাহর নামে, হে আল্লাহ! আপনি মুহাম্মাদ ও তার পরিবার-পরিজন এবং তার উম্মতের পক্ষ থেকে কবুল করে নিন। এরপর উক্ত দুম্বা কুরবানী করলেন। (সহীহ মুসলিম, হাদীস সং ১৯৬৭)

সফরে থাকা অবস্থায় ভাগে কুরবানী-

আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রা) বলেন, আমরা রাসুল (স) এর সাথে এক সফরে ছিলাম। এমতাবস্থায় কুরবানীর ঈদ উপস্থিত হল। তখন আমরা সাতজনে একটি গরু ও দশজনে একটি উটে শরিক হলাম।  (তিরমিযী, নাসাঈ, ইবনু মাজাহ।)

তবে একটি কথা বলা দরকার যে, মুকীম অবস্থায় অর্থাৎ বাড়ীতে অবস্থানকালে একটি পশুতে সাতটি পরিবার বা দশটি পরিবার অংশগ্রহণ করতে পারবে এর স্বপক্ষে কোন সহীহ হাদীস নেই।

কুরবানী দাতা যে সকল কাজ থেকে বিরত থাকবেন

উম্মু সালামাহ (রা) থেকে বর্ণিত, রাসুল (স) বলেছেন,তোমাদের মাঝে যে কুরবানী করার ইচ্ছা করে সে যেন যিলহজ্জ মাসের চাঁদ দেখার পর থেকে চুল ও নখ কাটা থেকে বিরত থাকে। ইমাম মুসলিম হাদিসটি বর্ণনা করেছেন। তার অন্য একটি বর্ণনায় আছে সে যেন চুল ও চামড়া থেকে কোন কিছু স্পর্শ না করে। অন্য বর্ণনায় আছে, কুরবানীর পশু যবেহ করার পূর্ব পর্যন্ত এ অবস্থায় থাকবে।

কোরবানির পশু যবেহ করার নিয়মাবলি

কুরবানীদাতা নিজের কুরবানীর পশু নিজেই যবেহ করবেন,যদি তিনি ভালভাবে যবেহ করতে পারেন। কেননা রাসুল (স) নিজেই যবেহ করেছেন। আর যবেহ করা আল্লাহ তায়ালার নৈকট্য অর্জনের একটি মাধ্যম। তাই প্রত্যেকের নিজের কুরবানী নিজে যবেহ করার চেষ্টা করা উচিত।

ইমাম বুখারী (র) বলেছেন, সাহাবী আবু মুসা আশআরী (রা) নিজের মেয়েদের নির্দেশ দিয়েছেন তারা যেন নিজ হাতে নিজেদের কুরবানীর পশু যবেহ করেন। ফাতহুল বারী। তার এ নির্দেশ দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, মেয়েরা কুরবানীর পশু যবেহ করতে পারেন। তবে কুরবানীর পশু যবেহ করার দায়িত্ব অন্যকে অর্পণ করা জায়েয আছে। কেননা সহীহ মুসলিমের হাদিসে এসেছে রাসুল (স) তেষট্টিটি কুরবানীর পশু নিজ হাতে যবেহ করে বাকিগুলো যবেহ করার দায়িত্ব আলী (রা) কে অর্পণ করেছেন। (সহীহ মুসলিম)

যবেহ করার সময় যে সকল বিষয় পালনীয়

১.পশুর প্রতি দয়া করা ও অনুগ্রহ প্রদর্শন করা জরুরি। এমন ব্যবস্থা নিয়ে যবেহ করা যাতে পশুর অধিক কষ্ট না হয় এবং সহজেই প্রাণ ত্যাগ করতে পারে। যবেহ যেন খুব তীক্ষ্ণ ধারালো ছুরি দ্বারা করা হয় এবং তা খুবই শীঘ্রতা ও শক্তির সাথে যবেহ স্থলে পোঁচানো হয়।

২.যবেহ করার সময় বিসমিল্লাহ বলতে হবে। কারণ এটা বলা ওয়াজিব। কারণ আল্লাহ তায়ালা বলেন, যার উপর আল্লাহর নাম উচ্চারণ করা হয়েছে তা থেকে তোমরা আহার কর। (সূরা আনআম -১১৮)

এবং যাতে আল্লাহর নাম উচ্চারণ করা হয়নি তা হতে তোমরা আহার কর না, এটা অবশ্যই পাপ। (সূরা আনআমঃ আয়াত নং-১২১)

আর নবী (স) বলেছেন, যা খুন বহায় এবং যাতে আল্লাহর নাম নেওয়া হয় তা ভক্ষণ কর। (বুখারী, মুসলিম)

যবেহকালীন সময়ে বিসমিল্লাহ এর সাথে আল্লাহু আকবার যুক্ত করা মুস্তাহাব। অবশ্য এর সঙ্গে কবুল করার দুআ ছাড়া অন্য কিছু অতিরিক্ত করা বৈধ নয়।

জাবির (রা) থেকে বর্ণিত একটি দুম্বা আনা হল। রাসুল (স) নিজ হাতে যবেহ করলেন এবং বললেন, বিসমিল্লাহ ওয়া আল্লাহু আকবার, হে আল্লাহ! এটা আমার পক্ষ থেকে এবং আমার উম্মতের মাঝে যারা কুরবানী করতে পারেনি তাদের পক্ষ থেকে। (আবু দাউদ)

৩.প্রাণ ত্যাগ করার পূর্বে পশুর অন্য কোন অঙ্গ কেটে কষ্ট দেওয়া হারাম। যেমন ঘাড় মটকানো, পায়ের শিরা কাটা, চামড়া ছাড়ানো ইত্যাদি কাজ জান যাওয়ার আগে করা যাবে না।

কোরবানির গোশত বন্টননীতি

মহান আল্লাহ বলেন, অতঃপর তোমরা তা হতে আহার কর এবং দুঃস্থ, অভাবগ্রস্তকে আহার করাও। (সূরা হজ্জ-২৮)

রাসুল (স) কুরবানীর গোশত সম্পর্কে বলেন, তোমরা নিজেরা খাও ও অন্যকে আহার করাও এবং সংরক্ষণ কর। (বুখারী, মুসলিম)

আহার করাও বাক্য দ্বারা অভাবগ্রস্তকে দান করা ও ধনীদের উপহার হিসাবে দেয়াকে বুঝায়। কতটুকু নিজেরা খাবে, কতটুকু দান করবে আর কতটুকু উপহার হিসাবে প্রদান করবে এর পরিমাণ সম্পর্কে কুরআন ও হাদিসে কিছু বলা হয়নি। তাই উলামায়ে কেরাম বলেছে, কুরবানীর গোশত তিন ভাগ করে একভাগ নিজেরা খাওয়া, একভাগ দরিদ্রদের দান করা ও একভাগ উপহার হিসাবে আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব ও প্রতিবেশীদের দান করা মুস্তাহাব (উত্তম)।

কুরবানীর গোশত যতদিন ইচ্ছা ততদিন সংরক্ষণ করে খাওয়া যাবে। তবে দুর্ভিক্ষের সময় তিন দিনের বেশি সংরক্ষণ করা যাবে না।

কুরবানীর গোশত কাফেরকে তার অভাবের কারনে, আত্মীয় বা প্রতিবেশী হওয়ার কারনে অথবা তাকে ইসলামের প্রতি অনুরাগী করার জন্য দেওয়া বৈধ। আর তা ইসলামের এক মহানুভবতা। 

tags: কুরবানী কার উপর ফরজ, কুরবানী অর্থ কি, কুরবানী ওয়াজিব হওয়ার শর্ত, কুরবানী শব্দের অর্থ কি, কুরবানী সম্পর্কে হাদিস, কুরবানী করার দোয়া, কুরবানীর মাসায়েল, কুরবানীর ইতিহাস, কুরবানীর পশু কেমন হতে হবে, কুরবানীর গোস্ত বন্টনের নিয়ম, কুরবানীর বিধান কি, কুরবানীর নিয়ম কানুন, কুরবানি করা কি ফরজ, কুরবানির ইতিহাস, কুরবানির পশু কেমন হবে, কুরবানির সহিহ দোয়া, কোরবানি অর্থ কি, কোরবানি শব্দের অর্থ কি, কোরবানি সম্পর্কে হাদিস, কোরবানি কোন ভাষার শব্দ, কোরবানি কার জন্য ওয়াজিব, কোরবানির ইতিহাস ও তাৎপর্য, কোরবানির দোয়া, কোরবানির ইতিহাস, কোরবানির ফজিলত, কোরবানির মাংস ভাগের নিয়ম, কোরবানির নিয়ম কানুন, কোরবানির মাংস বন্টন হাদিস, কোরবানির পশু কেমন হতে হবে, কোরবানীর পশু যবেহ করার নিয়ম, কোরবানীর মাসআলা, 

কুরবানি, কুরবানির প্রশ্ন উত্তর, কুরবানির ফযিলত, কুরবানির ইতিহাস, কুরবানির মাসআলা, কুরবানি অর্থ কি, কুরবানি শব্দের অর্থ, কুরবানি সম্পর্কিত হাদিস, কুরবানির আলোচনা, কুরবানির শরয়ী বিধান, কুরবানি কি ওয়াজিব না সুন্নাহ, কুরবানি কী, কোরবানি কাদের ওপর ফরজ, কুরবানি পশু জবাই ও তার শর্তাবলি, কুরবানির শর্ত ও নিয়মাবলী, করোনায় কুরবানি,

কুরবানী অর্থ, পৃথিবীর সর্বপ্রথম কুরবানী, ইব্রাহীম আ এর কুরবানী, কুরবানীর উদ্দেশ্য, কুরবানীর বিধান, কুরবানী বিশুদ্ধ হওয়ার শর্তাবলী, কুরবানীর পশু কেমন হবে, কুরবানী করার নিয়মাবলি, কুরবানীর ওয়াক্ত বা সময়, মৃত ব্যক্তির পক্ষে কুরবানী, নিজের ও পরিবারের পক্ষ থেকে একটি পশুই যথেষ্ট, কুরবানী দাতা যে সকল কাজ থেকে বিরত থাকবেন, কুরবানীর পশু যবেহ করার নিয়মাবলি, যবেহ করার সময় যে সকল বিষয় পালনীয়, কুরবানীর গোশত বন্টননীতি, কুরবানী অর্থ কি, কুরবানীর ইতিহাস, কুরবানীর নিয়ম, কুরবানীর পশু, কুরবানীর মাসায়েল, কুরবানী শব্দের অর্থ কি, কুরবানী সম্পর্কে কুরআনের আয়াত, কুরবানী সম্পর্কে হাদিস, কুরবানীর ফজিলত, কুরবানীর আলোচনা, কুরবানী ওয়াজিব হওয়ার শর্ত, কুরবানী কার উপর ফরজ, ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির কুরবানী,

কুরবানীর ইতিহাস ও শিক্ষা, কুরবানীর ইতিহাস ও তাৎপর্য, কুরবানী কখন ওয়াজিব, কুরবানীর পশু সংক্রান্ত জরুরি মাসায়েল,  কুরবানী সংক্রান্ত কিছু নিয়ম, যাদের উপর কুরবানী ওয়াজিব, মাসায়েল কুরবানী, কুরবানীর আগে পরে, কুরআন ও হাদীসে কুরবানী, কুরবানী বিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ মাসায়েল,  কুরবানী সংক্রান্ত নিয়ম কানুন, ইসলামের দৃষ্টিতে কুরবানীর গুরুত্ব ও তাৎপর্য, কুরবানীর ইতিহাস করণীয় বর্জনীয়,  কুরবানীর সঠিক ইতিহাস, কুরবানীর ইতিহাস উদ্দেশ্য ও কতিপয় বিধান, কুরবানীর ফাযায়েল ও মাসায়েল, কুরবানী কী ও কেন, কুরবানীর সঠিক নিয়ম ও মাসআলা, বর্তমান সময়ে করোনা ও আমাদের কুরবানী, কুরবানীর ওয়াজ, কুরবানীর বয়ান, কুরবানী করার দোয়া, কুরবানী সম্পর্কে আলোচনা, কুরবানী সম্পর্কে ওয়াজ,

কোরবানির দোয়া, কোরবানি অর্থ কি, কোরবানির ফজিলত, কোরবানি অর্থ, কোরবানি শব্দের অর্থ, কোরবানি দেওয়া কি, কোরবানীর ইতিহাস, কোরবানির শর্ত, কোরবানির মাংস বন্টনের নিয়ম, কোরবানির নিয়ম,  যাদের ওপর কোরবানি ওয়াজিব,  কোরবানির সওয়াব ও বিভিন্ন বিধান, কোরবানী, কোরবানীর মাসআলা, কোরবানীর পশু, কোরবানীর ফজিলত, কোরবানীর ইতিহাস, কোরবানী শব্দের অর্থ, কোরবানীর নিয়ম, কোরবানীর গুরুত্ব ও ফজিলত, কোরবানীর দিন করণীয় ও বর্জনীয় কাজ, কোরবানীর বয়ান,  

youtube video

মন্তব্য করুন

Top
Don`t copy text!